মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

নীলফামারী সদর উপজেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নীলফামারী একটি প্রাচীন জনপদ। ঐতিহাসিক বিভিন্ন নিদর্শন ও প্রাচীন গ্রন্থাদি থেকে এ অঞ্চলে আদিম জনবসতির অস্তিত্বের কথা জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতকে খননকৃত বিরাট রাজার দীঘি অপভ্রংশে বিন্নাদীঘি নীলফামারীর প্রাচীন ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

সম্রাট অশোকের সময় এ অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে। তারপর আর্য-ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা তাদের পরাজিত ও বিতাড়িত করে স্থায়ীভাবে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ত্রিশ বছর পূর্বেও নীলফামারীর বিভিন্ন জায়গায় বৌদ্ধ মঠ ছিল।

 

ইতিহাস পাঠে ধর্মপাল নামের দুইজন নৃপতির কথা জানা যায়। একজন কামরূপের এবং অন্যজন মগধের নৃপতি। এদের রাজত্বকালের ব্যবধান তিনশ’ বছর। মগধের রাজা ধর্মপালের রাজত্বকাল ৭৭৫ থেকে ৮১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। মগধের রাজা ধর্মপালের অধঃস্তন বংশধরদের অনেকে নীলফামারীতে রাজত্ব করেছিলেন। দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকাল ছিল ১০৭০ থেকে ১০৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, মাত্র এক বছর। এ সময়ে সেনাপতি দিব্যকের নেতৃত্বে বরেন্দ্র অঞ্চলে এক ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ ঘটে। যা ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে মহীপাল পরাজিত হলে দিব্যক বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং বর্তমান নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলায় তার রাজধানী স্থাপন করেন। তখন ডোমারের নাম ছিল ডোমনগর। দিব্যকের মৃত্যুর পর তার পুত্র ভীম ক্ষমতা লাভ করেন। রাজা মহীপালের দ্বিতীয় পুত্র রামপাল ভীমকে পরাজিত ও নিহত করে পিতৃ রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।

 

এ অঞ্চল একদা প্রকম্পিত হয়েছিল মাদারী ফকির ও নাগা সন্ন্যাসীদের পদভারে। ফকির মজনু শাহ, ভবানী পাঠক প্রভৃতি বিখ্যাত ফকির ও সন্ন্যাসীদের দৃপ্ত পদচারণা ছিল নীলফামারীর বুকে ও তিস্তার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে। এ অঞ্চলের উপর দিয়েই একদা ছুটে গেছে তিববতের দিকে বাংলা বিজয়ী সেনানায়ক ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর ঘোড়া। তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি আজও সমুজ্জ্বল এ এলাকার বৃদ্ধদের মনে।

 

আঠারো শতকের পূর্বে নীলফামারী নামক কোন স্থানের অস্তিত্ব ছিল না। সে সময় এ অঞ্চল কার্যির হাট চাকলা ও কাকিনা পরগণার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ব্রিটিশ আমলের শুরুতে রংপুর জেলাকে ২২টি থানায় বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে প্রথম যে চারটি থানার সৃষ্টি হয়, সেগুলো হলো- (১) ডিমলা, (২) দারোয়ানী, (৩) বারোয়ানী এবং (৪) বাগদুয়ার। দারোয়ানী থানা বর্তমান নীলফামারী সদর ও সৈয়দপুরের কিয়দংশ নিয়ে গঠিত ছিল। বারোয়ানী থানা জলঢাকা নিয়ে, ডিমলা থানা ডোমার, ডিমলা ও কিশোরগঞ্জ নিয়ে এবং বাগদুয়ার থানা সৈয়দপুর ও নীলফামারী নিয়ে গঠিত হয়েছিল।

মোঘল আমলে রংপুর একটি প্রদেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৮৭৩ সালে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে রংপুর জেলাকে বিভক্ত করে বিভিন্ন থানা ও মহকুমার সৃষ্টি করা হয়। বর্তমান ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার বাগডোগরায় নীলফামারী মহকুমার কার্যালয় স্থাপিত হয় এবং ১৮৭৫ সালের ১৮ মে তারিখে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালের ১৯ মে তারিখে বিভিন্ন প্রতিকূলতার জন্য বর্তমান নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পাশে পুরাতন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে মহকুমা দপ্তর স্থাপিত হয়। অবশ্য অনেকের মতে বর্তমান ডোমার উপজেলার বাগডোকরা গ্রামে প্রথম নীলফামারীর অস্থায়ী মহকুমা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। নীলফামারী মহকুমা গঠিত হয়েছিল নীলফামারী সদর, ডিমলা ও জলঢাকা থানার সমন্বয়ে। সরকারী নিদের্শে ১৯৮৪ সালে নীলফামারী মহকুমাকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়।

নামকরণ

দুই শতাধিক বছর পূর্বে এ অঞ্চলে নীল চাষের খামার স্থাপন করে ইংরেজ নীলকরেরা। এ অঞ্চলের উর্বর ভূমি নীল চাষের অনুকূল হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় নীলফামারীতে বেশি সংখ্যায় নীলকুঠি ও নীল খামার গড়ে ওঠে। ঊণবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই দুরাকুটি, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, টেঙ্গনমারী প্রভৃতি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়।

 

সে সময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মধ্যে নীলফামারীতেই বেশি পরিমাণে শস্য উৎপাদিত হতো এখানকার উর্বর মাটির গুণে। সে কারণেই নীলকরদের ব্যাপক আগমন ঘটে এতদঅঞ্চলে। গড়ে ওঠে অসংখ্য নীল খামার। বর্তমান নীলফামারী শহরের তিন কিলোমিটার উত্তরে পুরাতন রেল স্টেশনের কাছেই ছিল একটি বড় নীলকুঠি। তাছাড়া বর্তমানে অফিসার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত পুরাতন বাড়িটি ছিল একটি নীলকুঠি।